স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছিল দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা ফেনী। ২১ আগস্ট ২০২৪ রাত থেকে ফেনীসহ বাংলাদেশের ১১-১২টি জেলা বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। ২২ আগস্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ফেনীতে তাদের উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। তাদের সহায়তা করতে উদ্ধার কার্যক্রমে একাত্তর মুক্ত স্কাউট গ্রুপের দক্ষ রোভারদের একটি টিম সেই রাতে ঢাকা থেকে ফেনীর উদ্দেশে রওনা দেয়। একই সাথে গঠিত হয় "বন্যা পরবর্তী মেডিকেল ও খাদ্য ক্যাম্প ২০২৪" বা "Post Flood Medical & Food Camp-2024" কমিটি। ২২ আগস্ট ও রাতে কমিটি ভার্চুয়াল বৈঠক করে এবং সেখানে সকল পরিকল্পনা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। 

কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একাত্তর মুক্ত স্কাউট গ্রুপের রোভাররা পথচারীদের থেকে 'ক্রাউড ফান্ডিং' করবে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, যারা সর্বদা একাত্তরের উপর আস্থা রেখে একসাথে কাজ করেছে, তাদের সাথে যোগাযোগ করবে। ২৩ আগস্ট থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত একাত্তর মুক্ত স্কাউট গ্রুপের রোভাররা একনাগারে অর্থ এবং পণ্য সংগ্রহে কাজ করে। একই সাথে তারা তাদের ফেসবুক পেজে তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানিয়ে মানুষের কাছ থেকে সহায়তা চায়। 

সহজে অর্থ সংগ্রহের জন্য সকলকে বিকাশ, রকেট এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠানোর সুবিধা দেওয়া হয়। দীর্ঘ ৪ দিনের পরিশ্রমের পর সকলের সহযোগিতায় একাত্তর মুক্ত স্কাউট গ্রুপ প্রায় দশ লক্ষ টাকার সামগ্রী ক্রয় এবং সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। বন্যার্তদের নিকট বিতরণের জন্য ২৬ তারিখ ত্রাণ সামগ্রীর ১২০০ ব্যাগ প্রস্তুত করে প্রথম ধাপে ২৭ আগস্ট ভোরে ৩টি টিম ৬০০০ জন মানুষকে রান্না করে খাওয়ানোর দ্রব্যাদি, ১২০০ ব্যাগ ত্রাণ সামগ্রী, ১০০০ বোতলে ২৫০০ লিটার পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং অন্যান্য সামগ্রীসহ প্রায় ১১ টন ত্রাণ নিয়ে পরশুরাম, ফেনীর উদ্দেশে ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে।

তিনটি টিমের মধ্যে রয়েছে:

পরশুরাম যাওয়ার পথে ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলায় ৫০০ পরিবারের জন্য শুকনো খাবার ও চাল-ডাল নিয়ে ডিস্ট্রিবিউশন টিমের একটি অংশ চলে যায়। সকাল ৯টা নাগাদ টিমগুলো পরশুরামে পৌঁছে। সেখানে তারা সকল সামগ্রী মজুদ করে।

অতঃপর মেডিকেল টিম বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত ফুলগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করে, যাতে বানভাসি মানুষেরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পায়।

একইসাথে ডিস্ট্রিবিউশন টিম ফুলগাজী ও বক্স মাহমুদ ইউনিয়নে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করে এবং ফুলগাজী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঘাঁটিতে অবশিষ্ট ত্রাণসামগ্রী সংরক্ষণ করে। পরের দিন সকালে অবশিষ্ট ত্রাণসামগ্রী লক্ষীপুরের রামগঞ্জ উপজেলায় পৌঁছে দেওয়া হয় এবং কুকিং টিম খাবার রান্না করে ডিস্ট্রিবিউশন টিমের মাধ্যমে বানভাসি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। 


এইভাবে একাত্তর মুক্ত স্কাউট গ্রুপের কার্যক্রম চলতে থাকে। ৩০ আগস্ট ফেনীতে থাকা টিমগুলোর সাথে যোগ দেয় একাত্তরের সার্ভে টিম। সার্ভে টিমের কাজ ছিল প্রতিটি এলাকার বর্নায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরি করা এবং তাদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বাড়িঘরের তথ্য সংগ্রহ করা। এছাড়া সার্ভে টিমের সাথে আরো যোগ দেয় আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার ও জেনারেল হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি টিম। সেই দিন দুপুর থেকে শুরু হয় একাত্তর মুক্ত স্কাউট গ্রুপের সহযোগিতায় এবং আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার ও জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধানে বন্যা দুর্গত মানুষের জন্য পরিচালিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প। এই ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলমান থাকে, যেখানে হাজার হাজার মানুষকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। 


এদিকে ফেনীতে বন্যার পানি নেমে গেলে বন্যার্তরা যার যার বাড়ি ফিরে বন্যার আসল ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করতে পারে। অনেকের ঘর পুরোপুরি বিলীন হয়ে গিয়েছে, কারও ঘরের আসবাবসহ সবকিছু নষ্ট হয়ে গিয়েছে, কারও গবাদিপশু মারা গেছে, কারও মুরগির খামার পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, প্রায় সবারই কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে যার ফলে এলাকায় খাদ্য সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই একাত্তর মুক্ত স্কাউট গ্রুপের সার্ভে টিম ৩১ আগস্ট বন্যার্তদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রথম ধাপে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তালিকা তৈরির জন্য জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে। 


সেপ্টেম্বর রাতে একাত্তর মুক্ত স্কাউট গ্রুপের সকল টিম এবং আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার ও জেনারেল হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের টিম ফেনী থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়। এরই মাধ্যমে একাত্তর মুক্ত স্কাউট গ্রুপের "বন্যা পরবর্তী মেডিকেল ও খাদ্য ক্যাম্প ২০২৪” বা "Post Flood Medical & Food Camp-2024" এর প্রথম দুটি ধাপ সম্পন্ন হয়। তৃতীয় ধাপে ৫ সেপ্টেম্বর একাত্তর মুক্ত স্কাউট গ্রুপের একটি টিম কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের ফেনুয়া গ্রামে প্রায় ১৩ কেজি ওজনের এক একটি উপহারের বক্স নিয়ে যায়। উক্ত গ্রামের লোকালয়ে তখনো পানি থাকায় তারা উপহারের বক্স নৌকায় করে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেয়। এরই মাধ্যমে একাত্তর মুক্ত স্কাউট গ্রুপের "বন্যা পরবর্তী মেডিকেল ও খাদ্য ক্যাম্প ২০২৪" সফলভাবে সম্পন্ন হয়।